পারভেজ বাঙালী।
চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি।
চট্টগ্রামে গত কয়েক দিনের রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত দেশের ইতিহাসে বিরল ও একটি ব্যতিক্রমী প্রাকৃতিক দুর্যোগ উল্লেখ করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, "এই পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে সমন্বিত উদ্যোগ, মানবিকতা ও নাগরিক সচেতনতার মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হবে।"
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে গঠিত ১৯ সদস্যবিশিষ্ট সমন্বয় কমিটির জরুরি সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
৪ দিনে ১ হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি, একদিনেই রেকর্ড ৪১২ মি.মি.
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, গত চার থেকে পাঁচ দিনে চট্টগ্রামে প্রায় এক হাজার মিলিমিটারের কাছাকাছি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর মধ্যে একদিনেই রেকর্ড ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ। বিশ্বের অনেক শহরে পুরো বছরেও এত বৃষ্টিপাত হয় না উল্লেখ করে তিনি সবাইকে এই দুর্যোগের বাস্তবতা উপলব্ধি করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, "এখনও বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে কোথাও যেন মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি না হয়, সেদিকে চসিক সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।"
পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরানোর আহ্বান
বিশেষ করে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে চসিকের পক্ষ থেকে বারবার আহ্বান জানানো হচ্ছে। মেয়র বলেন, অনেক পরিবার শেষ সম্বল হারানোর আশঙ্কায় পাহাড়ি এলাকা ছাড়তে চায় না। শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; তাদের আস্থা অর্জন করে, বুঝিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসতে হবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
খাল-ড্রেন দখল ও অবৈজ্ঞানিক স্থাপনা চিহ্নিত
বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা জানিয়ে মেয়র বলেন, বহু খাল ও ড্রেন অতীতে দখল, ভরাট এবং অবৈজ্ঞানিক স্থাপনা নির্মাণের কারণে সংকুচিত হয়ে গেছে। কোথাও খালের ওপর স্থাপনা নির্মাণ, কোথাও গরুর খামার, আবার কোথাও ড্রেনের মুখ বন্ধ করে ফুটপাত নির্মাণের কারণে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করে খাল ও ড্রেনের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে কাজ চলছে।
সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেডের প্রশংসা করে তিনি বলেন, "তারা যেভাবে খাল পুনরুদ্ধার ও প্রশস্ত করার কাজ করছে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এসব কাজ না হলে এবারের রেকর্ড বৃষ্টিপাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।"
"২০২৫ সালে ধারাবাহিকভাবে খাল-নালা পরিষ্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে নগরীর প্রায় ৬০ শতাংশ জলাবদ্ধতা কমানো সম্ভব হয়েছে। একসময় বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, জিইসি মোড়, চকবাজার, দুই নম্বর গেট, বাকলিয়াসহ যেসব এলাকায় দীর্ঘসময় পানি জমে থাকত, বর্তমানে সেখানে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।"
— মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন
বর্ষা শেষেই বাকি খালের কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা
মেয়র জানান, হিজড়া খাল, জামালখান খাল, রামপুরা খাল, বামনশাহী খাল ও আজব বাহার খালসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খালের কাজ বর্ষার কারণে সাময়িকভাবে ধীরগতিতে চলছে। বর্ষা শেষে ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে এসব কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে আরও ৪০টি খাল পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নের পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। চসিক, সেনাবাহিনী, জেলা প্রশাসন, পুলিশ, ওয়াসা, সিডিএসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নগরবাসীকে দুঃখ প্রকাশ ও সচেতন হওয়ার আহ্বান
পানিবন্দি নগরবাসীর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে মেয়র বলেন, "যেসব এলাকায় এখনও মানুষ পানিবন্দি আছেন, তাদের দুর্ভোগের জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। মানবিক দায়িত্ব থেকে আমরা তাদের পাশে আছি এবং পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।"
একই সাথে নাগরিকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "খাল, নালা ও ড্রেনে প্লাস্টিক, পলিথিন ও ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে হবে। অনেক জলাবদ্ধতার জন্য আমাদের নিজেদের অসচেতনতাও দায়ী। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।"
দুর্যোগের সময় সঠিক ও দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন করার জন্য তিনি সংবাদমাধ্যমের প্রতিও ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এ জাতীয় আরো খবর...