পারভেজ বাঙালী।
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি।
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বন্দর পরিস্থিতি। জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে এই টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার উদ্যোগের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়ে তারা তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ কার্যালয়ের সামনে এক বিশাল সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে স্কপ। সমাবেশ শেষে নেতারা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার কাছে স্মারকলিপি হস্তান্তর করেন।
চট্টগ্রাম স্কপের যুগ্ম সমন্বয়কারী এস কে খোদা তোতনের সভাপতিত্বে এবং ইফতেখার কামাল খানের সঞ্চালনায় সমাবেশে শ্রমিক নেতারা বলেন, এনসিটির মতো একটি লাভজনক ও গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল কোনো বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়া দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। এটি সম্পূর্ণ বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা উচিত।
অন্যদিকে, ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর সমন্বয়ক ও শ্রমিক দল নেতা হুমায়ুন কবির সংবাদমাধ্যমকে জানান:
"বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্দর ইজারা দেওয়ার যে কোনো চক্রান্ত আমরা শক্ত হাতে প্রতিহত করব। আমরা সরকারকে আমাদের আপত্তির কথা জানিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিচ্ছি। সরকার যদি সাধারণ শ্রমিক ও দেশের মানুষের পালস বুঝতে না পারে, তবে কঠোর আন্দোলন শুরু হবে। দলমত নির্বিশেষে চট্টগ্রামবাসী বন্দর রক্ষায় মাঠে নামবে।"
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একই স্মারকে ‘দুই নীতি’: বিভ্রান্তি চরমে
এনসিটি নিয়ে চলমান বিতর্কের ঘি ঢেলেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-১ অধিশাখা থেকে গত ৪ জুন ইস্যু করা দুটি চিঠি। একই তারিখ ও একই স্মারক নম্বর সম্বলিত চিঠি দুটিতে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বার্তা দেওয়া হয়েছে:
প্রথম চিঠি: এতে বলা হয়েছে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চলমান আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। তবে তাদের আগ্রহ না থাকলে পুরো প্রক্রিয়া বাতিল করে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই স্মারকের অন্য চিঠিতে নৌপরিবহনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার বরাত দিয়ে বলা হয়, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আলোচনা অবশ্যই অব্যাহত রাখতে হবে।
একই সময়ে একই বিষয়ে এমন পরস্পরবিরোধী ও রহস্যজনক নির্দেশনার পর বন্দর প্রশাসন ও অংশীজনদের মনে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। সরকারের প্রকৃত অবস্থান আসলে কী, তা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের এই বিতর্কের মধ্যেই এনসিটি পরিচালনার জন্য একটি নতুন বিকল্প প্রস্তাব এসেছে। বিএনপির সাবেক দুজন সংসদ সদস্যের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং এনসিটির সাবেক একটি অপারেটর মিলে গঠিত তিন দলীয় একটি দেশীয় কনসোর্টিয়াম যৌথভাবে টার্মিনালটি পরিচালনার আগ্রহ দেখিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই দেশীয় কনসোর্টিয়ামের দেওয়া প্রস্তাবটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ে অনেক বেশি লাভজনক এবং বন্দরবান্ধব।
চলতি বছরের শুরুতেও ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি দেওয়ার তোড়জোড় শুরু হলে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও স্কপের তীব্র আন্দোলনের মুখে বন্দর অচল হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সে সময় বাধ্য হয়ে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া স্থগিত করে টার্মিনালটি বন্দরের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাসের মাথায় আবারও সেই একই উদ্যোগ নেওয়ায় ক্ষোভের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ জাকারিয়া জানান, "আমরা এনসিটি পরিচালনার জন্য একাধিক পক্ষ থেকে প্রস্তাব পেয়েছি। দেশের স্বার্থ রক্ষা করে প্রচলিত আইন ও বিধি মেনেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।"
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. নাসির উদ্দিন জানান, মন্ত্রণালয় থেকে যে নির্দেশনা আসবে, বন্দর কর্তৃপক্ষ সেটাই বাস্তবায়ন করবে।
তবে বন্দর সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শ্রমিকদের দাবি উপেক্ষা করে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করা হলে চট্টগ্রাম বন্দর আবারও বড় ধরনের অস্থিতিশীলতার মুখে পড়তে পারে।
এ জাতীয় আরো খবর...