পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধানে ছিনতাই হওয়া অটোরিকশা উদ্ধার; দীর্ঘ দুই দশকের পুলিশি জীবনের অনন্য প্রাপ্তি: অটোরিকশা ফিরে পেয়ে ফুল হাতে পঙ্গু পরিবারের ভালোবাসায় সিক্ত নওগাঁ জেলা পুলিশ
নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি: মোঃ রাফি হোসেন
দীর্ঘ দুই দশকের পুলিশি জীবনে অসংখ্য সফল অভিযান, অপরাধ দমন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করলেও মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও দোয়া যে একজন পুলিশ কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি—তারই এক হৃদয়স্পর্শী উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে নওগাঁয়।
গত ১১/১২ জুন রামকৃষ্ণ সরকার নামে এক ব্যক্তি মোবাইল ফোনে নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম-কে জানান, ১০ জুন সকালে কয়েকজন দুষ্কৃতিকারী তার ছেলে রকিকে ডাবের পানির সঙ্গে বিষাক্ত কিছু খাইয়ে অজ্ঞান করে পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস অটোরিকশাটি ছিনতাই করে নিয়ে যায়।
ঘটনার সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ সুপার ভুক্তভোগীকে নওগাঁ সদর থানায় মামলা দায়েরের পরামর্শ দেন। মামলা রেকর্ড হওয়ার পর পুলিশ সুপারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে নওগাঁ সদর থানা ও জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সমন্বয়ে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়।
দীর্ঘ এক সপ্তাহ ধরে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, ডাটা অ্যানালাইসিস এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করা হয়। পরে নওগাঁ, বগুড়া, জয়পুরহাট ও গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে অজ্ঞান পার্টির সদস্যদের গ্রেফতার করা হয় এবং ছিনতাই হওয়া অটোরিকশাটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
আদালতের নির্দেশে দ্রুততম সময়ের মধ্যে উদ্ধার হওয়া অটোরিকশাটি প্রকৃত মালিক রামকৃষ্ণ সরকারের কাছে ফিরিয়ে দেয় নওগাঁ জেলা পুলিশ।
অটোরিকশাটি ফিরে পেয়ে রামকৃষ্ণ সরকার ও তার পরিবারের আনন্দের যেন সীমা ছিল না। পরিবারের একমাত্র জীবিকার মাধ্যম ফিরে পাওয়ার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে সোমবার (৩ আগস্ট) তিনি তার বৃদ্ধ মা, স্ত্রী, সন্তান এবং উদ্ধার হওয়া অটোরিকশাসহ নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে উপস্থিত হন। সঙ্গে ছিল ফুলের তোড়া ও একরাশ ভালোবাসা।
দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে শারীরিকভাবে অসুস্থ রামকৃষ্ণ সরকারের শরীরে ক্যাথেটার লাগানো থাকায় তিনি ভবনের উপরে উঠতে পারেননি। বিষয়টি জানতে পেরে পুলিশ সুপার নিজেই নিচে নেমে এসে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। উদ্ধার হওয়া অটোরিকশাকে ঘিরে পুরো পরিবার পুলিশ সুপারকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় এবং নওগাঁ জেলা পুলিশের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
এ সময় পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, মানুষের ভালোবাসাই একজন পুলিশ সদস্যের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তিনি বলেন, এই ভালোবাসা নওগাঁ জেলা পুলিশের দায়িত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যতেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থেকে জনগণের জানমাল রক্ষায় জেলা পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করে যাবে।
সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল যখন রামকৃষ্ণ সরকারের বৃদ্ধ মা পুলিশ সুপারের মাথায় হাত রেখে দোয়া করেন। সেই আশীর্বাদ যেন শুধু পুলিশ সুপার নয়, সমগ্র নওগাঁ জেলা পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, ভালোবাসা ও আস্থার এক অনন্য প্রতীক হয়ে ওঠে।
এই ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হয়েছে, আন্তরিকতা, পেশাদারিত্ব ও দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে পুলিশ মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম। নওগাঁ জেলা পুলিশের এই মানবিক উদ্যোগ এলাকাবাসীর মাঝেও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
এ জাতীয় আরো খবর...