মোঃ আমির হোসাইন ছাদেকী, জেলা প্রতিনিধি (বান্দরবান): বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের মিয়ানমার অংশে আরাকান আর্মির (এএ) নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে মো. সাইফুল (২৫) নামে এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। বিস্ফোরণে তাঁর দুই পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকাল আনুমানিক ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে নাইক্ষ্যংছড়ি ব্যাটালিয়ন (১১ বিজিবি)-এর অধীনস্থ টার্গুপাড়া বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত পিলার-৫২ সংলগ্ন মিয়ানমার অংশে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত মো. সাইফুল নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দোছড়ি ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পাইনছড়ি এলাকার বাসিন্দা। তাঁর পিতার নাম মো. সাবের আহমদ।
বিজিবি সূত্রে জানা যায়, সীমান্ত পিলার-৫২ সংলগ্ন বাংলাদেশ-মিয়ানমার শূন্যলাইন থেকে আনুমানিক ৪০০ মিটার মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন ডুইল্যাঝিরি ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
ওই এলাকায় পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইনের ওপর সাইফুলের পা পড়লে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে তাঁর দুই পা বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনি গুরুতর আহত হন।
স্থানীয় সূত্র ও বিজিবির প্রাথমিক তথ্যমতে, বাঁশ কাটার উদ্দেশ্যে সাইফুল মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিলেন। বাঁশ কাটার সময় অসাবধানতাবশত পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইনের ওপর পা পড়লে বিস্ফোরণ ঘটে।
পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ইসমাত জাহান ইতু বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সীমান্ত এলাকায় অহেতুক ঘোরাফেরা না করার জন্য স্থানীয়দের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে সীমান্তবর্তী এলাকায় ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে বাংলাদেশি নাগরিক নিহতের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সীমান্ত পিলার ৫১ থেকে ৫৪-এর আশপাশের এলাকায় বসবাসরত কিছু বাংলাদেশি উপজাতি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে নিয়মিত বাঁশ কাটতে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে থাকেন।
সীমান্তের দুর্গম এলাকার এসব বাসিন্দা দীর্ঘদিন ধরে জীবিকার প্রয়োজনে পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে বাঁশসহ বিভিন্ন বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে আসছেন।
তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত এবং বিভিন্ন স্থানে ল্যান্ডমাইন পুঁতে রাখার কারণে সীমান্তবর্তী মানুষের চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, সীমান্তের ওপারে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণের এ ঘটনা নতুন করে নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। জীবিকার তাগিদে যাতে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশি নাগরিকরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ না করেন, সে বিষয়ে আরও সচেতনতা সৃষ্টি ও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে বাংলাদেশি নাগরিক নিহতের ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়রা জানান, মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে বিভিন্ন স্থানে ল্যান্ডমাইন পুঁতে রাখার কারণে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় গবাদিপশু চরানো, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহসহ বিভিন্ন কাজে যাতায়াতকারী মানুষের জন্য এ ধরনের বিস্ফোরণ মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সীমান্তবর্তী ভালুকিয়া, তুমব্রু ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাইন বিস্ফোরণের আশঙ্কা বিরাজ করছে। জীবিকার তাগিদে কৃষিজমি ও বাগানে কাজ করতে গেলেও তাদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করে।
স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি বলেন, সীমান্ত এলাকার মানুষ চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। কোথায় মাইন পুঁতে রাখা আছে তা কেউ জানে না। এ কারণে সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করা জরুরি।
উল্লেখ্য, নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের ওপারে চলমান সংঘাতের কারণে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইন নিয়ে এর আগেও সীমান্তবর্তী এলাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
ফলে সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ জাতীয় আরো খবর...