রৌমারীর বিখ্যাত শ্রমের হাট,সে হাটেই শ্রমিকেরা আজ উপেক্ষিত
কে,এম,জাকির
রৌমারী(কুড়িগ্রাম)প্রতিনিধি
ভোর সাড়ে চারটা। চারপাশ যখন কেবল আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠছে, ঠিক তখনই কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার শাপলা চত্বরে শুরু হয় জীবনের অন্য এক স্পন্দন। ঘুম জড়ানো চোখে, কাঁধে কোদাল, ঝুড়ি কিংবা কাস্তে নিয়ে জড়ো হতে থাকেন শত শত মানুষ। কোনো উৎসবের আমেজ নয়, এটি বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক নির্মম ও চিরন্তন দৃশ্যপট। এটি রৌমারীর ঐতিহ্যবাহী ‘শ্রম বিক্রির হাট’। প্রতিদিন ভোরে মাত্র ৪০০ থেকে ৬০০ টাকার বিনিময়ে এখানে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার জন্য বিক্রি হয় মানুষের মাথার ঘাম আর পেশির শক্তি। কয়েক দশক ধরে চলমান এই হাটটি রৌমারী অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির এক নীরব চালিকাশক্তি। ভোর সাড়ে চারটা থেকে শুরু হয়ে সকাল ছয়টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় এই হাটের মূল বেচাকেনা। যারা শ্রম কিনতে আসেন, আর যারা শ্রম বেচতে আসেন—উভয়ের মাঝেই এক অদ্ভুত মেলবন্ধন তৈরি করেছে এই শাপলা চত্বর। স্মৃতির আয়নায় শ্রমের হাট এই হাটের ইতিহাস মোটেও নতুন নয়। শ্রম কিনতে আসা স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি মোঃ নাড্ডু মন্ডল জানান, প্রায় ৫০-৬০ বছর ধরে এই বাজারে এভাবেই শ্রম বিক্রি হয়ে আসছে। আরেকজন নিয়মিত ক্রেতা আব্দুল মান্নান বলেন, "আমি দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে এই বাজার থেকে কামলা বা শ্রমিক নিচ্ছি। আমাদের প্রয়োজনেই যেমন ওদের দরকার, ওদেরও সংসার চালাতে আমাদের দরকার।
শ্রমিকদের কাছেও এই স্থানটি এক পরম ভরসার নাম। দীর্ঘ ৮-৯ বছর ধরে এখানে শ্রম বিক্রি করতে আসা নজরুল ইসলামের সরল স্বীকারোক্তি, "এখানে আসলে অনায়াসে কাজ পাই, তাই আর কোথাও যাওয়া লাগে না।" ২১ বছর ধরে এই হাটে আসা আরেক অভিজ্ঞ শ্রমিক আবু তালেব বলেন, "এই বাজার আমারে কোনোদিন খালি হাতে ফেরায় নাই। আসলেই কাজ পাই, তাই নিশ্চিন্তে চলে আসি।" বহাল তবিয়তে হাট, কিন্তু নেই বসার জায়গা কয়েক দশকের পুরনো এই বিখ্যাত শ্রমিকের হাটটি আজও বহাল তবিয়তে টিকে থাকলেও, এর ভেতরের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা একেবারেই শূন্য। প্রতিদিন ভোরে কয়েকশো মানুষ এখানে এসে জমায়েত হন, কিন্তু তাদের মাথা গোঁজার বা একটু বসার মতো কোনো ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই। রোদ হোক কিংবা তীব্র ঝড়-বৃষ্টি—খোলা আকাশের নিচেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয় এই শ্রমজীবী মানুষদের। রৌমারীর বিশিষ্ট সমাজসেবক ও সংগঠক জনাব শাহ মোহাম্মদ আব্দুল মোমেন এই মানবিক সংকটটি অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন: "কয়েক দশকের পুরনো রৌমারীর এই বিখ্যাত শ্রমিক হাটটি আজও সচল রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এই শ্রমজীবী মানুষের একটু বসার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট জায়গা নেই। যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আমার জোর দাবি, এই মেহনতি মানুষগুলো যাতে ভোরে এসে অন্তত শান্তিতে বসতে পারেন, এমন একটি স্থায়ী বসার জায়গা বা শেড তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।" সময়ের দাবি ও কর্তৃপক্ষের করণীয় যে শ্রমিকদের শ্রমের ওপর ভিত্তি করে আমাদের কৃষি, দালানকোঠা আর উন্নয়ন দাঁড়িয়ে আছে, তাদের ন্যূনতম নাগরিক সম্মান দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। রৌমারী শাপলা চত্বরের এই শ্রমের হাটটিকে শুধু একটি বাজার হিসেবে না দেখে, একে একটি 'শ্রমিক কল্যাণ কেন্দ্র' হিসেবে গড়ে তোলা উচিত। একটি স্থায়ী যাত্রীছাউনি বা শেড: তীব্র রোদ কিংবা বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে চত্বরের পাশে একটি বসার জায়গা করা অত্যন্ত জরুরি বিশুদ্ধ খাবার পানি ও টয়লেটের ব্যবস্থা: ভোরবেলা দূর-দূরান্ত থেকে আসা এই মানুষগুলোর জন্য নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। রৌমারীর শাপলা চত্বর কেবলই একটি স্থান নয়, এটি শত শত পরিবারের অন্নসংস্থানের ভরসাস্থল। এই হাটের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে এবং খেটে খাওয়া মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটাতে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত একটি বসার জায়গা নির্মাণে এগিয়ে আসবেন—এমনটাই রৌমারীবাসীর প্রত্যাশা।
আজ রোজ বুধবার ১৭-জুন ২০২৬।
এ জাতীয় আরো খবর...