মোঃ রাফি হোসেন, নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি:
নওগাঁর ধামইরহাটে মেরিনা বেগম (৪৫) নামে এক নারীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে মরদেহে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে পরিচয় গোপনের চেষ্টা করা হয়েছে। ঘটনার ১২ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বেল্ট ও নিহতের জুতার ব্যাগসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তাররা হলেন—ধামইরহাট উপজেলার মড়লই গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মো. বাবুল হোসেন (৪৯) এবং একই গ্রামের মো. তারেক রহমান (২১)। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় আরও দুইজন জড়িত রয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশ ও মামলার প্রাথমিক তদন্ত সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ আগস্ট সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে ধামইরহাট থানার ২ নম্বর আগ্রাদ্বিগুন ইউনিয়নের তালপুকুর-মাহমুদপুর গ্রামের (ভালকাডাঙ্গা) একটি আমবাগানের গভীর জঙ্গলে আগুনে পোড়া এক নারীর মরদেহ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। খবর পাওয়ার পর নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম ধামইরহাট থানার অফিসার ইনচার্জ ও পত্নীতলা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে দ্রুত ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি তিনি নিজে ঘটনাটি তদারকি শুরু করেন।
প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যেও প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ একটি মধ্যবয়সী নারীর আগুনে পোড়া মরদেহ দেখতে পায়। মরদেহের পাশে পড়ে ছিল তার ব্যবহৃত কিছু প্রসাধনী সামগ্রী ও পরিচয়পত্র। প্রথমদিকে ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ ক্লুলেস।
এদিকে একই সময়ে কাউসার আলী নামে এক ব্যক্তি তার মায়ের নিখোঁজের বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করতে ধামইরহাট থানায় আসেন। পরে তাকে ঘটনাস্থলে নেওয়া হলে তিনি মরদেহটি তার মা মেরিনা বেগমের বলে শনাক্ত করেন। মেরিনা কয়েক দিন আগে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আর ফিরে আসেননি। এরপর বিষয়টি সিআইডি ও পিবিআইকে অবহিত করা হয়।
পুলিশ জানায়, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা, স্থানীয় পর্যায়ে তদন্ত এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্তের কাজ শুরু হয়। মধ্যরাতের পর পত্নীতলা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরীফ ও ধামইরহাট থানার ওসি মিন্টুর নেতৃত্বে অভিযান শুরু করে পুলিশ। প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে অভিযান কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও টানা ছয় থেকে সাত ঘণ্টার অভিযানে প্রথমে সাবেক ইউপি সদস্য মো. বাবুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে মো. তারেক রহমানকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুই আসামি হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। তাদের দেখানো স্থান থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বেল্ট এবং হত্যার পর অন্যত্র ফেলে দেওয়া নিহতের জুতার ব্যাগ উদ্ধার করা হয়।
প্রেমের সম্পর্ক থেকে হত্যার পরিকল্পনা
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, নিহত মেরিনা বেগমের সঙ্গে গ্রেপ্তার আসামি বাবুল হোসেনের পূর্বপরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক ছিল। মোবাইল ফোনে নিয়মিত কথোপকথনের একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে মেরিনা বাবুলকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকেন। বিয়ে না করলে তার বাড়িতে যাওয়ার কিংবা আত্মহত্যা করার হুমকিও দিয়েছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি সামাল দিতে বাবুল মেরিনাকে ১৬ আগস্ট বিয়ে করার কথা জানান। ওইদিন দুপুরে মেরিনা বাড়ি থেকে বের হন। পরে বাবুল তারেকসহ আরও দুইজনকে মেরিনাকে নিয়ে আসার জন্য ধামইরহাটের সাহাপুর এলাকায় পাঠান। তারা সাহাপুর বাজার থেকে মেরিনাকে আগ্রাদ্বিগুন বাজারে নিয়ে আসে।
পরে বাবুল মোটরসাইকেলে সেখানে গিয়ে একটি তেলের দোকান থেকে তিন লিটার পেট্রোল কেনেন। এর মধ্যে দুই লিটার মোটরসাইকেলে এবং এক লিটার একটি বোতলে নিয়ে ব্যাগে রাখেন বলে তদন্তে জানা গেছে।
এরপর চারজন মিলে মেরিনাকে আগ্রাদ্বিগুন বাজার থেকে মনিহারী-তালপুকুর সড়কের একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে প্রায় ৩০০ ফুট দক্ষিণে একটি আমবাগানের ভেতরে নেওয়া হয় তাকে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, সেখানে তারেকের কোমরে থাকা বেল্ট খুলে মেরিনার গলায় পেঁচিয়ে ধরেন আসামিরা। একপর্যায়ে শ্বাসরোধে তার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর বাবুল মরদেহে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে মেরিনার শরীরের ঊর্ধ্বাংশ পুড়ে যায়। মরদেহের পরিচয় গোপন ও আলামত নষ্ট করতেই আগুন দেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
পরে মেরিনার সঙ্গে থাকা দুটি ব্যাগের একটি নিয়ে বাবুল সড়কের দিকে চলে যান এবং জুতার ব্যাগটি আমবাগানের ভেতরে ফেলে দেন। হত্যাকাণ্ডের পর আসামিরা বাবুলের বাড়িতে গিয়ে নিহতের কাছ থেকে নেওয়া টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ সময় বাবুল ছাড়া অন্যরা প্রত্যেকে আড়াই হাজার টাকা করে পেয়েছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
নিখোঁজের চার দিন পর মিলল মরদেহ
মামলার প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, মেরিনা বেগমের স্বামী মো. হাছেন আলী (৫৫) ও ছেলে মো. কাউসার আলী জীবিকার প্রয়োজনে কুমিল্লায় অবস্থান করছিলেন। গত ১৪ আগস্ট বেলা আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে মেরিনা গরুর জন্য ঘাস কাটতে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর তিনি আর বাড়িতে ফেরেননি। পরে তার নিখোঁজের খবর পেয়ে ছেলে কাউসার কুমিল্লা থেকে বাড়িতে ফিরে আসেন এবং থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে যান। সেখান থেকেই পোড়া মরদেহের পরিচয় শনাক্তের সূত্র মেলে।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামিসহ মোট চারজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তের স্বার্থে অপর দুই আসামির পরিচয় আপাতত প্রকাশ করা হয়নি। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, “নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড এবং আগুনে পোড়ানো ক্লুলেস মরদেহের ঘটনায় পুলিশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে রহস্য উদঘাটন করেছে। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নওগাঁ জেলা পুলিশ জেলার যেকোনো ধরনের অপরাধ আইন অনুযায়ী কঠোরভাবে দমন করবে। পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধে জেলা পুলিশ সর্বাত্মকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।”
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে জড়িত অপর আসামিদের গ্রেপ্তার এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আলামত উদ্ধারে তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এ জাতীয় আরো খবর...