রিপোর্টার মোঃ আশরাফ উদ্দিন চোধুরী
পূর্ববাংলার সমাজ যখন মধ্যযুগীয় সামন্তবাদী সংস্কার ও রক্ষণশীলতার আবরণ ভেদ করে আধুনিকতার পথে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে, তখন চট্টগ্রামের এক অভিজাত ও রক্ষণশীল পরিবার থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন এক অসাধারণ সাহসী তরুণী—জাহানারা আঙ্গুর। তিনি ছিলেন ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতি, নারী জাগরণ, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক উজ্জ্বল নাম; এক অগ্নিকন্যা, যিনি প্রচলিত সামাজিক বিধিনিষেধকে অগ্রাহ্য করে নিজস্ব বিশ্বাস ও আদর্শের পথে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়েছিলেন।
জাহানারা আঙ্গুর ছিলেন পাকিস্তান আমলের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, প্রথিতযশা আইনজীবী এবং ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের (এমএনএ) নির্বাচিত সদস্য অ্যাডভোকেট সুলতান আহমদের কনিষ্ঠ কন্যা। ১৯৪৮ সালের ১৬ জুন তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস মীরসরাই হলেও তাঁর বেড়ে ওঠা চট্টগ্রাম নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজারের চৈতন্যগলির পারিবারিক বাসভবনে।
প্রথাগত মুসলিম রক্ষণশীল পরিবেশে বেড়ে উঠলেও তাঁর পরিবারে শিক্ষার প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। অ্যাডভোকেট সুলতান আহমদ তাঁর সন্তানদের উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় জাহানারা আঙ্গুরও বিদ্যালয় পেরিয়ে ভর্তি হন চট্টগ্রাম সিটি কলেজে—যা সে সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় একটি সাহসী পদক্ষেপ ছিল।
১৯৬৬ সালে পাথরঘাটা মেনকা গার্লস হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৭০ সালে একই কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
ছাত্ররাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী উত্থান
ষাটের দশকে ছাত্ররাজনীতি ছিল প্রায় সম্পূর্ণভাবে পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত একটি ক্ষেত্র। যারা রাজনীতিতে অংশ নিতেন, তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সে সময় হাতে গোনা কয়েকজন মুসলিম ছাত্রী ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে রাফিয়া আখতার ডলি, রাশেদা, খালেদা এবং জাহানারা আঙ্গুর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কিন্তু জাহানারা আঙ্গুর ছিলেন অন্যদের থেকে ভিন্ন। তিনি শুধু রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; সমান আগ্রহে যুক্ত ছিলেন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও অভিনয়ের সঙ্গে। স্কুলজীবনেই, ১৯৬৪ সালে, তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। পরে সিটি কলেজে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণ দ্রুত বিকশিত হয়।
তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে কলেজে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছাত্রলীগের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ছাত্রীদের মধ্যে সংগঠনটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য।
১৯৬৮ সালে ছাত্রলীগের মনোনয়নে তিনি চট্টগ্রাম সিটি কলেজ ছাত্র সংসদের সম্পাদিকা নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে কলেজের মহিলা শাখা ছাত্র সংসদের ভিপি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন তাঁর রাজনৈতিক চেতনা গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
গণআন্দোলনের অগ্নিশিখা
জাহানারা আঙ্গুর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়ন চালাচ্ছে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, এই বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ স্বাধীনতা।
১১ দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বিরোধী আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি হয়ে উঠেছিলেন চট্টগ্রামের রাজপথের এক পরিচিত মুখ। মিছিল, সভা, সমাবেশ, হরতাল ও পিকেটিং—সবখানেই ছিল তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি।
মহিলা পরিষদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তিনি আগুনঝরা বক্তৃতা দিতেন। ব্যানার-ফেস্টুন হাতে সাধারণ মানুষের কাতারে দাঁড়িয়ে অংশ নিতেন আন্দোলনে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর রাজনৈতিক চেতনা ও নেতৃত্বের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে পুরো চট্টগ্রামে।
তাঁর এই রাজনৈতিক ব্যস্ততা অবশ্য পরিবারকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। একটি রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের অবিবাহিত কন্যা রাতদিন রাজনীতি করে বেড়াচ্ছেন—সে সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় এটি ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ঘটনা।
মায়ের গোপন গর্ব, বাবার নীরব শ্রদ্ধা
মুক্তিযোদ্ধা, লেখিকা ও নারী নেত্রী বেগম মুশতারী শফির স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে জাহানারা আঙ্গুরের পারিবারিক জীবনের এক মানবিক ছবি।
তিনি বলতেন, তাঁর মা ছিলেন কঠোর পর্দানশীন। প্রকাশ্যে কিছু না বললেও অন্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একজন গভীর অনুরাগী ছিলেন। নামাজ শেষে মেয়ের জন্য যেমন দোয়া করতেন, তেমনি বঙ্গবন্ধুর জন্যও দোয়া করতেন এবং দেশের মুক্তি কামনা করতেন।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও পিতা অ্যাডভোকেট সুলতান আহমদ কন্যার প্রতি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন যে, মতের অমিল কখনোই তাঁদের পিতা-কন্যার সম্পর্কের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক দলের নাম নয়, মানুষের আদর্শ, সততা ও দেশসেবার মনোভাবই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই কন্যার রাজনৈতিক অবস্থানকে তিনি কখনো ছোট করে দেখেননি।
মঞ্চে এক বিস্ময়
জাহানারা আঙ্গুরের আরেকটি পরিচয় ছিল সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে।
১৯৬৩ সালে বেগম মুশতারী শফির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘বান্ধবী সংঘ’-এর নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি অভিনয়ে অংশ নেন। ১৯৬৬ সালে বিধায়ক ভট্টাচার্য রচিত হাস্যরসাত্মক নাটক ‘সেই তিমিরে’-তে তিনি অভিনয় করেন একজন বৃদ্ধ স্কুলশিক্ষকের চরিত্রে।
প্রায় ছয় ফুট লম্বা, আত্মবিশ্বাসী এই তরুণী কোনোদিন নাটক করেননি। তবুও চরিত্রটি গ্রহণ করেছিলেন অসাধারণ সাহসের সঙ্গে। কারণ একটি বিষয় তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল—বৃদ্ধের বেশে অভিনয় করলে পরিবারের কেউ তাঁকে চিনতে পারবে না।
কারণ তাঁর পরিবারে নাটকে অভিনয় করা মোটেও সহজভাবে নেওয়ার মতো বিষয় ছিল না।
মঞ্চে তাঁর অভিনয় ছিল এতটাই সাবলীল যে দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে যান। সেই নাটক তাঁর সুপ্ত সাংস্কৃতিক প্রতিভার এক অনন্য প্রকাশ ঘটায়।
ভালোবাসা, সংগ্রাম ও জীবনবোধ
জাহানারা আঙ্গুর ছিলেন স্বাধীনচেতা, আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ়চরিত্রের মানুষ। তিনি নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপন করতেন। লোকলজ্জা বা সামাজিক চাপ তাঁকে কখনো দমিয়ে রাখতে পারেনি।
চট্টগ্রাম সিটি কলেজের সহপাঠী সেই এক বিরল কাহিনী
এ জাতীয় আরো খবর...