বাবার নীরব আত্মত্যাগ সন্তানের জন্য এক অদৃশ্য নিয়ামত
আবু নাসের মহিউদ্দিন,
আমি আমার সন্তানদের শেখাবো যে, পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলার দেওয়া সবচেয়ে বড় নিয়ামতগুলোর একটি হলো একজন দায়িত্বশীল বাবা হওয়া যা আমার সন্তানের জন্য প্রথম শিক্ষা।
আমি সন্তানদের শেখাবো যেন তাদের জীবনের প্রতিটি স্বস্তি, প্রতিটি নিরাপত্তা, প্রতিটি হাসি এবং প্রতিটি সুন্দর মুহূর্তের পেছনে একজন মানুষের নীরব সংগ্রাম লুকিয়ে আছে। প্রতিটি খেলনা, প্রতিটি নতুন পোশাক, প্রতিটি গরম খাবার, প্রতিটি শিক্ষার সুযোগ এবং প্রতিটি নিশ্চিন্ত ঘুমের রাত—এসবের পেছনে আছে তাদের বাবার ঘাম, শ্রম, দুশ্চিন্তা ও আত্মত্যাগ যা কখনো দৃশ্যমান হয় না।
ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা একটি মহান ইবাদত। একজন বাবা যখন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কিংবা প্রবাসের নিঃসঙ্গতা বুকে নিয়ে পরিবারের জন্য উপার্জন করেন, তখন তিনি কেবল অর্থ উপার্জন করেন না; তিনি নিজের দায়িত্ব পালন করেন, যা আল্লাহর নিকট অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল।
পিতা হৃদয় নিংড়ানো ঐকান্তিক দরদ, ভালবাসা ও স্নেহ-মমতার কোমল পরশে সন্তানকে লালন-পালন করবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তাদের (সন্তান ও জননীর) ভরণ-পোষণের ভার পিতার উপরই ন্যস্ত’ (বাক্বারাহ ২/২৩৩)। পিতার নিকট হ’তে খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় মৌলিক উপকরণ সন্তানের প্রাপ্য অধিকার। সন্তানের এ সমস্ত প্রয়োজন পূরণে পিতা অমনোযোগী হ’লে অবশ্যই তাকে জবাবদিহি করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই আপন আপন দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে’।[18] সন্তানের জীবনের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, রোগমুক্ত রাখা, স্বাস্থ্যবান রূপে গড়ে তোলা এবং জীবনের উন্নতি ও বিকাশকল্পে পিতাকে যথোপযুক্ত দায়িত্ব পালন করতে হবে।
আমি আমার সন্তানদের বলবো, তোমাদের বাবা হয়তো সবসময় "আমি তোমাদের ভালোবাসি" কথাটি বলেন না। কিন্তু ভোরে ঘুম থেকে উঠে কাজে যাওয়ার মধ্যে, নিজের শখ বিসর্জন দেওয়ার মধ্যে, তোমাদের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের আগে রাখার মধ্যে এবং তোমাদের ভবিষ্যতের চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটানোর মধ্যেই তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ পায়।
বাবারা অনেক সময় নীরব থাকেন। তারা নিজেদের কষ্ট, ব্যর্থতা, ক্লান্তি কিংবা চোখের জল পরিবারের সামনে প্রকাশ করেন না। কারণ তারা চান, তাদের সন্তানরা নিরাপদ থাকুক, হাসিখুশি থাকুক এবং জীবনের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাক।
আমি আমার সন্তানদের শেখাবো, যখন তোমরা খাবারের টেবিলে বসবে, তখন মনে করবে—এই রিজিক আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, কিন্তু সেই রিজিক ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তোমাদের বাবা কত পরিশ্রম করেছেন। যখন নতুন পোশাক পরবে, তখন মনে করবে—এর পেছনে হয়তো তোমাদের বাবার কোনো অপূর্ণ ইচ্ছা চাপা পড়ে আছে। যখন আরামদায়ক বিছানায় ঘুমাবে, তখন মনে করবে—কোনো এক রাতে তোমাদের বাবা হয়তো নিজের ঘুম হারাম করে তোমাদের ভবিষ্যতের চিন্তা করেছেন।
আমি চাই আমার সন্তানরা বুঝুক, বাবা শুধু পরিবারের উপার্জনকারী নন; তিনি পরিবারের ছায়া, নিরাপত্তা, শক্তি ও আশ্রয়। তিনি সেই মানুষ, যিনি নিজের ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফিরেও পরিবারের হাসি দেখলে প্রশান্তি খুঁজে পান।
রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পিতা-মাতার সন্তুষ্টি। তাই আমি আমার সন্তানদের শেখাবো, বাবার প্রতি সম্মান দেখানো শুধু ভদ্রতা নয়; এটি ইবাদত। বাবার জন্য দোয়া করা শুধু ভালো কাজ নয়; এটি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। তাঁর কষ্ট বুঝতে চেষ্টা করা শুধু মানবিকতা নয়; এটি ঈমানের সৌন্দর্য।
একদিন তোমরা বড় হবে। হয়তো তোমাদের জীবনেও দায়িত্ব আসবে। সেদিন যখন পরিবারের জন্য সংগ্রাম করবে, তখন বুঝতে পারবে তোমাদের বাবা কতটা নীরবে কত বড় যুদ্ধ লড়েছেন। তখন যেন তোমরা তাঁর ত্যাগকে স্মরণ করো, তাঁর জন্য দোয়া করো এবং তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশ করতে কার্পণ্য না করো।
কারণ অনেক সন্তান বাবার কদর বুঝতে শেখে তখন, যখন বাবার চুল সাদা হয়ে যায় কিংবা তিনি এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। কিন্তু প্রকৃত সৌভাগ্যবান সেই সন্তান, যে বাবার জীবিত অবস্থাতেই তাঁর মূল্য বুঝতে পারে, তাঁর হাত চুম্বন করতে পারে, তাঁর জন্য দোয়া করতে পারে এবং তাঁর মুখে হাসি ফোটাতে পারে।
হাদীছে নিজ পরিবারের জন্য ছওয়াবের আশায় ব্যয় করার ফলস্বরূপ একটি ‘ছাদাক্বা’ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে’।[19] অন্য হাদীছে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, أَفْضَلُ دِيْنَارٍ يُنْفِقُهُ الرَّجُلُ دِيْنَارٌ يُنْفِقُهُ عَلَى عِيَالِهِ. ‘সর্বোত্তম ব্যয় হচ্ছে ঐ অর্থ (দিনার) যা কোন ব্যক্তি ব্যয় করে নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য’।[20]
আজ রোজ মঙ্গলবার ১৬-জুন ২০২৬।
এ জাতীয় আরো খবর...