যমুনার ভাঙ্গনে ঢাকা-তারাকান্দি মহাসড়ক হুমকিতে শত শত পরিবার, যেকোনো মুহূর্তে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার শঙ্কা
স্টাফ রিপোর্টার :এস কে শিপন
তীব্র ঘূর্ণিস্রোত আর যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে চরম হুমকির মুখে পড়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক যোগাযোগ মাধ্যম ঢাকা-তারাকান্দি মহাসড়ক। টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার শাখারিয়া নয়াপাড়া সুইচগেট থেকে মাত্র ২০ গজ দক্ষিণেই শুরু হয়েছে এই প্রলয়ঙ্কারী ভাঙন। ইতিমধ্যেই সড়কটির একটি বিশাল অংশ নদীগর্ভে বিলীন হতে শুরু করায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। মহাসড়কটি পুরোপুরি ধসে গেলে শুধু যে যোগাযোগ ব্যবস্থা পঙ্গু হবে তা-ই নয়, বরং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে শত শত পরিবার ভিটেমাটিহীন এবং পানিবন্দি হয়ে পড়ার চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, বর্ষা ও উজানের ঢলে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে নদী অববাহিকায় তীব্র ঘূর্ণিস্রোতের সৃষ্টি হয়েছে। এই আগ্রাসী স্রোত সরাসরি এসে আঘাত করছে ঢাকা-তারাকান্দি মহাসড়কে। ভাঙনের তীব্রতা এতটাই প্রকট যে, সড়কের পিচ ও মাটি ধসে পড়ার দৃশ্য চোখে পড়ার মতো। ফলে যেকোনো মুহূর্তে এই গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইনটি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
মানবিক বিপর্যয়ের মুখে লোকালয়
হঠাৎ শুরু হওয়া এই ভাঙনে স্থানীয় বাসিন্দারা চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই মহাসড়কটি শুধু যাতায়াতের মাধ্যমই নয়, এটি ওই অঞ্চলের জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষামূলক বাঁধ হিসেবেও কাজ করে আসছিল। আতঙ্কিত এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, "রাস্তাটি যদি পুরোপুরি ভেঙে যায়, তবে যমুনার পানি সরাসরি আমাদের লোকালয়ে ঢুকে পড়বে। শত শত ঘরবাড়ি, ফসলি জমি আর গবাদি পশু নিমেষেই তলিয়ে যাবে। আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু হারিয়ে পথে বসতে হবে।
যান চলাচল ব্যাহত, চরম বিপাকে সাধারণ মানুষ
গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে ভাঙনের কারণে দূরপাল্লার ভারী যানবাহন চলাচল ইতিমধ্যেই সীমিত ও ধীরগতির হয়ে পড়েছে। রাস্তার একাংশ ধসে পড়ায় একমুখী (ওয়ান-ওয়ে) যান চলাচল করতে হচ্ছে, যার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ যানজট। চালক ও যাত্রীরা চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ধীরে ধীরে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে। অবস্থা বেগতিক দেখে স্থানীয় এলাকাবাসী মহাসড়ক ও নিজেদের ঘরবাড়ি রক্ষায় নিজেরাই স্বউদ্যোগে পদক্ষেপ নিয়েছেন। ভাঙন কিছুটা প্রতিরোধ করতে তারা রাস্তার পাশে থাকা গাছ কেটে নদীতে ফেলছেন। বর্তমান অবস্থায় ঢাকা-তারাকান্দি মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে গাছ ও গাছের ডালপালা ফেলে রাস্তা এক প্রকার অবরোধ করে রাখা হয়েছে, যাতে ভারী গাড়ির চাপে রাস্তাটি আরও নিচে দেবে না যায়। এর ফলে মহাসড়কটিতে চলাচলকারী হাজার হাজার যাত্রী ও চালক চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
প্রশাসনের উদাসীনতা ও দ্রুত স্থায়ী বাঁধের দাবি
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিস্থিতি এতটা শোচনীয় রূপ নিলেও এখন পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। রাস্তাটি প্রায় শেষের পথে, অথচ কর্তৃপক্ষের এমন নিষ্ক্রিয়তায় চরম ক্ষোভ ও দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছেন আশেপাশের এলাকার সর্বস্তরের মানুষ।
যদিও পরিদর্শনকারী কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধে জিওব্যাগ ও বালুর বস্তা ফেলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, যমুনার এই প্রলয়ঙ্কারী স্রোতের সামনে জিওব্যাগের মতো সাময়িক ব্যবস্থা কোনো কাজে আসবে না। এই মুহূর্তে মহাসড়ক ও বিস্তীর্ণ জনপদ রক্ষা করতে হলে অনতিবিলম্বে সরকারি উদ্যোগে টেকসই ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন। অন্যথায়, মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে এই অঞ্চলের বিশাল একটি অংশ।
এ জাতীয় আরো খবর...