১৪ বছরে শেষ হয়নি খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ কাজ
আল মাহমুদ প্রিন্স,
প্রতিনিধি খুলনা,
চীনের দুঃখ হোয়াংহু নদী হলে, খুলনা দুঃখ শিপইয়ার্ড সড়ক। ১৪ বছরে শেষ হয়নি খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ। খুলনা শহরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত সড়কটি গত ১৪ বছর ধরে নগরবাসীর গলার কাঁটা হিসেবে রয়ে গেছে। খুলনা শহরের এটি প্রবেশদ্বার হওয়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষের চলাচলের মাধ্যম এটি। শুকনো মৌসুমে ধুলো-বালি ঝড় আর বর্ষা মৌসুমে কাঁদা-মাটির কবলে পড়ে চরম ভোগান্তিতে পার করছে নগরবাসী। খুলনার আলোচিত শেখ বাড়ির স্নেহধন্য মাহবুব ব্রাদার্স ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের যোগসাজসে কেডিএ’র প্রকল্প কর্মকর্তাসহ কিছু অসাধু কর্মকর্তা এই ভোগান্তির নেপথ্যে রয়েছে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে মাহবুব ব্রাদার্স কাজের অতিরিক্ত বিল উঠিয়ে নিয়ে গেছে সুকৌশলে। যা ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর ব্যাপক আলোচিত হয়| যদিও কেডিএ কর্তৃপক্ষ পরে মাহবুব ব্রাদার্সাকে জরিমান করে এবং কার্যাদেশ বাতিল করে। কিন্তু নতুন করে প্রকল্পটি শেষ করতে আবারও সংশোধনী এনে পুণরায় পঞ্চমবারের মত একনেকে উত্থাপিত হতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। যা পূর্বের ব্যয় থেকে বর্তমান ব্যয় প্রায় ২০০% বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এ নিয়ে জনমনে সৃষ্টি হয়েছে চরম ক্ষোভ। আলোচ্য সড়ক প্রকল্পটি ৩ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ শিপইয়ার্ড রোড প্রসস্থকরণ প্রকল্পটি ২০১২ সালে গ্রহণ করা হয়। তখন প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৯৮ দশমিক ৯০ কোটি টাকা। যা গত ২০১৩ সালের ৩০ জুলাই একনেক সভায় অনুমোদিত হয়।
প্রকল্পটির সমাপ্তকাল ছিল ২০১৪ সালের ৩০ জুন। কিন্তু কোন কারণ ব্যতিরেকে পুণঃবিশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে সরকারি অর্থ তশ্রুফ করার জন্য ৩০% ব্যায় বৃদ্ধি করে পুণরায় ১২৬ দশমিক ৫৮ কোটি টাকা ব্যায় প্রক্কলিত ব্যয়ে দ্বিতীয়বার একনেক সভায় অনুমোদন করানো হয়। পাশাপাশি প্রকল্প সমাপ্তির জন্য সময় বৃদ্ধি করে ২০১৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত| তৃতীয়বারের একনেক সভায় ১০০% ব্যয় বৃদ্ধি করে ২৫৯ কোটি টাকা প্রাক্কলিত মূল্যে প্রকল্পটির অনুমোদন গ্রহণ করা হয়| কথিত আছে এই বৃদ্ধিকৃত (২৫৯-১২৬)-১৩৩ কোটি টাকা প্রকল্প পরিচালক আরমান হোসেনসহ কেডিএ’র কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শেখ হাসিনার চাচাত ভাই শেখ হেলাল, শেখ জুয়েল এবং ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্সের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা হয়| যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়|
প্রকল্পটি অনুমোদনের পর আতাউর রহমান লিমিটেড এবং মাহাবুব ব্রাদার্স লিমিটেডকে (জয়েন্ট ভেঞ্চার) কার্যাদেশ প্রদান করা হয়| ঠিকাদার কার্যাদেশ প্রাপ্তির পর কাজ শুরু করে। কাজ চলমান থাকা অবস্থায় পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে বিগত ২০২৪ সালের ২১ মে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় ৪র্থ বারের মতো মাত্র ৫ কোটি টাকা হ্রাস করে ২৫৪ কোটি টাকায় অনুমোদন নেওয়া হয় এবং পাশাপশি ৪র্থবারের মত ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করা হয়| আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে ২৫৪ কোটি টাকার মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণে ৯৯ কোটি টাকা এবং অবশিষ্ট ১৫৫ কোটি টাকা ভৌত নির্মাণ কাজের ব্যায় ধরা হয়েছে|
ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্স এরই মধ্যে মোটা অংকের ঘুষ লেনদেনের কাজ শেষ না করেই মাধ্যমে ১৫৫ কোটি টাকার কার্যাদেশের ৭০.৩৬ কোটি টাকার বিল উত্তোলন করে নিয়ে যায়|
সূত্রটি জানায়, এখানে সুকৌশলে চুক্তি বাতিলকৃত ঠিকাদারকে পরিশোধকৃত বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত বিল (কাজ না করা সত্ত্বেও) বর্তমান একনেকে উপস্থাপনকৃত প্রকল্প ব্যায়ের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে| তাছাড়া ১৫৫ কোটি টাকার ভৌত নির্মাণ ব্যয়ের প্রায় ৫০% অর্থাৎ ৭৫ কোটি টাকা ব্যয় করার পর প্রকল্প ব্যয় ১২২ কোটি টাকায় উত্তীর্ণ করে অনুমোদনের জন্য একনেকে উপস্থাপনের কারণ হচ্ছে এই যে, প্রকৃতপক্ষে ৮০ কোটি টাকা অবশিষ্ট থাকলেও ৪২ কোটি টাকা ব্যায় বৃদ্ধি করে পূর্বের ফ্যাসিস্ট সরকাররের আমলের চুরিটাকে জায়েজ করা হচ্ছে|
সূত্রটি আরও জানায়, ২০২৪-এর ৫ই আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হলে শেখ বাড়ির আত্মীয় মাহাবুবের কাজ তৎকালীন সরকার তথা মন্ত্রণালয় ও কেডিএ বাতিল করে দেয়|
প্রকাশিত সংবাদ খুলনাস্থ দুদক অফিস ও দুদক প্রধান কার্য্যালয়ের দৃষ্টি গোচর হলে এ বিষয়ে তদন্ত করে দেখার জন্য দুদক প্রধান কার্য্যালয় খুলনা অফিসকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়| সে হিসেবে খুলনা দুদক অফিস সরেজমিনে শিপইয়ার্ড রোড প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন এবং প্রয়োজনীয় পরিমাপ গ্রহণ করে| খুলনাস্থ দুদক অফিসের তদন্তে উদঘাটিটত হয় যে, প্রকল্পের অনেক ধরনের কাজ না করা সত্ত্বেও বিপুল পরিমাণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে| যেমন সম্পূর্ণ সড়কের কোথাও কার্পেটিং কাজ করা হয়নি| কিন্তু তদসত্ত্বেও কার্পেটিং এর বিল পরিশোধ করা হয়েছে| এইরূপ আরো কিছু আইটেমের কাজ না হওয়া সত্ত্বেও চুক্তি বাতিলকৃত ঠিকাদার মাহাবুব ব্রাদার্সকে সে সকল আইটেমের উপর বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
কেডিএ চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ হোসেন (পিএসসি) বলেন, এ প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের কোন সুযোগ নেই। যখন একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয় তখন প্র্যাক্কলন ব্যয় হিসাব করে একনেকে উত্থাপন করা হয়। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যদি এ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয় সেই ক্ষেত্রে খুলনা সিটি কর্পোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং সড়ক ও জনপদ দিয়ে প্রকল্পটি সম্পন্ন করা যেতে পারে।
আজ রোজ রবিবার ৭ জুন ২০২৬ ইং।
এ জাতীয় আরো খবর...