পারভেজ বাঙালী।
চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি।
চট্টগ্রাম নগরীর দীর্ঘদিনের জলযন্ত্রণার স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব সেবা সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, পরিকল্পিত খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং সমন্বিত মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে চট্টগ্রামকে একটি আধুনিক ও জলাবদ্ধতামুক্ত নগরীতে পরিণত করা হবে।
বুধবার টাইগারপাসস্থ চসিক কার্যালয়ে চসিকের সার্বিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে গঠিত কমিটির ৮ম সাধারণ সভায় সভাপতির বক্তব্যে মেয়র এসব কথা বলেন। সভায় বিগত সভার কার্যবিবরণী অনুমোদনের পাশাপাশি নগরীর জলাবদ্ধতা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ও মশা নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক অপরাধ দমনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জলাবদ্ধতা মুক্ত চট্টগ্রাম গড়ার নতুন মহাপরিকল্পনা
মেয়র জানান, সাম্প্রতিক টানা ভারী বর্ষণেও নগরীর অধিকাংশ এলাকায় পানি জমে থাকেনি, যা ড্রেনেজ ব্যবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বাকলিয়া ও আগ্রাবাদের মতো এলাকায় গত এক দশকে যেখানে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকত, গত বছর তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ইতিমধ্যেই ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ জলাবদ্ধতা কমাতে সক্ষম হয়েছে চসিক।
জলাবদ্ধতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে নতুন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে মেয়র বলেন:
"জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে এর আগে ৩৬টি খালের কাজ হলেও বাস্তবে চট্টগ্রামে আরও বহু খাল রয়েছে, যা দখল ও ভরাটের কারণে মৃতপ্রায়। তাই শুধু পূর্বনির্ধারিত ২১টি নয়, নতুন মহাপরিকল্পনায় ৪০টিরও বেশি খালকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন ডিপিপি (ডিপার্টমেন্টাল প্রজেক্ট প্রপোজাল) প্রস্তুত করা হচ্ছে।"
পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে জলাবদ্ধতার কারণ ও তাৎক্ষণিক সমাধান নিশ্চিত করতে বিশেষ 'মনিটরিং সেল' গঠন করা হচ্ছে।
মেডিকেল এলাকা হচ্ছে ‘জিরো ট্রাফিক জোন’, উচ্ছেদ ও জরিমানা জোরদার
বৃহত্তর চট্টগ্রামের রোগীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে ওলিখা মসজিদ থেকে প্রবর্তক মোড় পর্যন্ত এলাকাকে 'জিরো ট্রাফিক জোন' ঘোষণা করা হয়েছে। এই সড়কের পাশে কোনো অ্যাম্বুলেন্স, রিকশা, সিএনজি বা ভাসমান দোকান দাঁড়াতে পারবে না। বিকেল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ট্রাফিক পুলিশকে এই এলাকায় কঠোর অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফুটপাতগুলোতে পথচারীদের হাঁটার নান্দনিক স্ট্রাকচার তৈরি এবং দেয়ালগুলো গ্রাফিতির মাধ্যমে সাজানো হবে। ভাসমান ডাব ও ফল বিক্রেতাদের চমেক হাসপাতালের পূর্ব গেটে নির্দিষ্ট স্থানে পুনর্বাসন করা হবে।
একই সাথে, ফুটপাত ও সড়ক অবৈধ দখলমুক্ত করতে এবং নির্মাণাধীন ভবনে মশার লার্ভা পাওয়া গেলে এখন থেকে শুধু উচ্ছেদ নয়, নিয়মিত মোটা অঙ্কের জরিমানা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে জরিমানার বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রচার করা হবে যেন জনসচেতনতা তৈরি হয়। এছাড়া আবাসিক এলাকার পকেট গেটগুলো বন্ধ রাখার কারণে সৃষ্ট যানজট নিরসনে গেটগুলো উন্মুক্ত করার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মেয়র জানান, গত ডিসেম্বর থেকে চসিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত আমেরিকান প্রযুক্তিনির্ভর বিটিআই (Bacillus thuringiensis israelensis) লার্ভিসাইড ব্যবহার শুরু হওয়ায় গত ছয় মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং মৃত্যুহার শূন্যে নেমে এসেছে। তবে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নাগরিকদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে নগরীর ক্রমবর্ধমান বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আরেফিননগর ও হালিশহরের পাশাপাশি আরও প্রায় ১০০ কানি জমি ক্রয় করে নতুন ল্যান্ডফিল নির্মাণের উদ্যোগ চলমান রয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (OCC) পরিসংখ্যান টেনে মেয়র উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, শ্রমজীবী বাবা-মা বাইরে থাকার কারণে ১২ বছরের কম বয়সী শিশুরা অপরাধী চক্রের শিকার হচ্ছে। এই সংকট দূরীকরণে প্রতিটি ওয়ার্ডে পর্যায়ক্রমে খেলার মাঠ ও ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি 'ডে-কেয়ার সেন্টার' গড়ে তোলা হবে। পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের সন্তানদের সুরক্ষায় প্রতিটি ফ্যাক্টরিতে বাধ্যতামূলক ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের বিষয়ে চসিক শীঘ্রই বিজিএমইএ ও গার্মেন্টস মালিকদের সাথে মতবিনিময় সভা করবে।
এছাড়া ভবঘুরে ও মানসিক বিকারগ্রস্তদের চিকিৎসার জন্য একটি 'মানসিক রোগ বিকাশ কেন্দ্র' এবং প্রবীণদের জন্য 'জেরিয়াট্রিক কেয়ার' বা ওল্ড এজ হোম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিশোর গ্যাং ও মাদক নিয়ন্ত্রণে চসিক 'জিরো টলারেন্স' নীতি অনুসরণ করবে।
সড়ক বিভাজক রক্ষা ও মালিদের নতুন কর্মপরিধি
নগরীর ফ্লাইওভার ও সড়ক বিভাজকের (মিড আইল্যান্ড) সৌন্দর্যবর্ধনে গাছ লাগানোর পাশাপাশি সেগুলো সুরক্ষায় চুরি রোধক বেষ্টনী দেওয়া হবে। ঢাকার আদলে চট্টগ্রামের নির্দিষ্ট কিছু এলাকার সড়ক বিভাজকের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বিভিন্ন সরকারি সংস্থাকে দেওয়ার জন্য মেয়রের পক্ষ থেকে ডিও লেটার দেওয়া হবে। এছাড়া চসিকের বর্তমান ৫০-৬০ জন মালিকে ৪১টি ওয়ার্ডে সুনির্দিষ্টভাবে ভাগ করে দেওয়া হবে, যাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়।
৫ লক্ষাধিক শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন
সভায় জানানো হয়, আগামী ২৭ জুন তারিখে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় ভিটামিন “এ” প্লাস ক্যাম্পেইন-২০২৬ এর আওতায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৫,৬৪,০০০ (পাঁচ লক্ষ চৌষট্টি হাজার) শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিনের সঞ্চালনায় উক্ত সাধারণ সভায় বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, চসিকের বিভাগীয় প্রধান, ম্যাজিস্ট্রেট ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এ জাতীয় আরো খবর...