লিখেছেন,
শ্রদ্ধেয় সিরাজুল মামুন স্যারের ছোট বোন
Sultana Jahan Sumona
সহযোগী অধ্যাপক
(এম. এ, পি এইচ ডি, ইংলিশ)
আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
===============================
[০১ ]
আসিফ এনতাজ রাবির লেখাটা পড়ার পর থেকেই মামুন ভাইকে নিয়ে ভাবছি।
লেখক তাকে হুমায়ূন আহমেদের কোনো চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন—তুলনাটা অদ্ভুত রকম মিলে যায়।
সত্যিই তো, আমাদের চারপাশে মানুষ অনেক, কিন্তু জীবনকে নিজের মতো করে দেখার সাহস কয়জনের থাকে? অধিকাংশই ভিড়ের সঙ্গেই হাঁটে। কেউ কেউ শুধু আলাদা পথে হাঁটার দুঃসাহস দেখায়—মামুন ভাই ঠিক তেমন মানুষ।
ছোটবেলার এক বিকেলের কথা স্পষ্ট মনে আছে।
একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
—ভাইয়া, তুমি তো এত মেধাবী ছিলে, বিসিএস দিলে নিশ্চয়ই দেশের সেরা হতে। চেষ্টা করলে না কেন?
তিনি তখন ধীরে ধীরে বললেন,
—সরকারি চাকরি করলে কত টাকাই বা
পেতাম বলো? সেই টাকায় কয়জন গরিবের পাশে দাঁড়াতে পারতাম? মানুষের জীবন কি শুধু পদোন্নতি আর ফাইলের স্তূপ?
আমি চুপ করে ছিলাম।
তিনি আবার বললেন,
আমি চাই মানুষের জন্য বাঁচতে। যদি মরে যাই, অন্তত কিছু মানুষ যেন বলে, "লোকটা আমাদের জন্য ছিল।"!
সেদিন তার কথার গভীরতা ঠিক বুঝিনি।
পরে বুঝেছি—তিনি আসলে ভিন্ন পথের পথিক।
রবার্ট ফ্রস্টের সেই লাইন দুটো যেন তার জন্যই লেখা:
I took the less travelled by,
And that has made all the difference.
[ ০২ ]
মানবিকতার সবচেয়ে জীবন্ত ছবিটা দেখেছিলাম নব্বইয়ের দশকের শুরুতে।
তখনো ঝরনা কলমের যুগ পুরো শেষ হয়নি। মামুন ভাই দামী কলমের ভক্ত—ভাঙা কলম সারিয়ে রাখতেন যত্ন করে।
একদিন তিনি গেলেন ফুটপাতে বসা এক কলম মেরামতকারীর কাছে। বৃদ্ধ লোকটা ছোট্ট কাঠের বাক্স খুলে বসে আছে। চারপাশে কালি মাখা নীরবতা। ব্যবসা নেই বললেই চলে—বলপেন এসে তার পেশাটাকেই প্রায় মেরে ফেলেছে।
ভাইয়া জিজ্ঞেস করলেন,
—চাচা, সারাদিনে কত রোজগার হয়?
লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—এই তো বাবা… দশ-বিশ টাকা। এখন আর মানুষ কালির কলম চালায় কই!
—ছেলে-মেয়ে আছে?
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—আছে তো… কিন্তু তাদের সময় কই আমার জন্য?
আমি দেখলাম, মামুন ভাই চুপ হয়ে গেলেন। তারপর পকেট থেকে একটা পাঁচশ টাকার নোট বের করে লোকটার হাতে দিলেন।
—বাবা, এত টাকা! ভাঙতি পাব কই?
—ভাঙতি লাগবে না চাচা, পুরোটা আপনার।
বৃদ্ধের চোখে জল এসে গেল। ঠোঁট কাঁপছিল, কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না। শুধু অপলক তাকিয়ে রইল—যেন হঠাৎ আকাশ থেকে আলো নেমে এসেছে।
সেদিন ফেরার পথে ভাইয়া খুব চুপ ছিলেন। শুধু বললেন,
—মানুষের সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য টাকা না—ভালোবাসার অভাব।
কত মানুষ যে তার হাত ধরে ভরসা পেয়েছে তার হিসাব নেই—অনাথ , এতিম ছাত্র, নওমুসলিম।
একসময় আমাদের বাড়িটাই যেন ছোট্ট একটা আশ্রম হয়ে উঠল। মানুষ আসত কষ্ট নিয়ে, ফিরত একটু স্বস্তি নিয়ে।
[০৩ ]
পাঁচই আগস্টের জুলাই বিপ্লবের পর দেশের মানুষ নতুন স্বপ্ন দেখছে। চারদিকে পরিবর্তনের হাওয়া। কিন্তু শুধু স্লোগান দিয়ে তো সমাজ বদলায় না। বদলায় সেইসব মানুষের হাত ধরে—যাদের বুকের ভেতর মানুষের জন্য মমতা আছে, যাদের চোখে আছে ভিন্ন পথের আলো।
মামুন ভাইদের মতো মানুষেরাই হয়তো সেই স্বপ্নের ফেরিওয়ালা—যারা কম চলা পথে হেঁটে অন্যদের পথ দেখায়।
---------------------
এ জাতীয় আরো খবর...