মোঃ আবদুল মোতালেব
নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি :--
২০১১ সালের ৬ জুলাইয়ের সেই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজার মানিক মিয়া এভিনিউর রক্তাক্ত সকালটি আজও বাংলাদেশের মানুষের চোখে ভাসে। সেদিন সকালে বিরোধী দলের ডাকা হরতালের সমর্থনে তৎকালীন বিরোধী দলীয় চিফ-হুইপ বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নুল আবেদিন ফারুক এর নেতৃত্বে সংসদ ভবনের সামনে শান্তিপূর্ণভাবে একটি মিছিল বের করার প্রস্তুতি চলছে । জয়নুল আবেদিন ফারুকের সঙ্গে ছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য সৈয়দা আশরাফি পাপিয়া, শাম্মী আক্তার, এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজাম, রেহানা আক্তার রানুসহ বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী।
জয়নুল আবেদিন ফারুক সবসময়ই বিশ্বাস করেন- গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধীদলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করার অধিকার থাকবে। কিন্তু সেদিন কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই বিশ্বাস ভেঙে চুরমার করে দেয় স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার লেলিয়ে দেওয়া পুলিশ বাহিনী । মিছিল শুরু করলে পুলিশ মিছিলটি ঘেরাও করে ফেলে এবং মিছিল করতে বাধা দেয় । পুলিশ ও সংসদ সদস্যদের সাথে কথা কাটাকাটি শুরু হয়, এরপর কোনো প্রকার উসকানি ছাড়াই পুলিশ সদস্যরা বিরোধী দলীয় চিফ-হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক সহ উপস্থিত সংসদ সদস্যদের সাথে দুর্ব্যবহার করতে শুরু করে। তৎকালীন পুলিশের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ ও সহকারী কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারের নেতৃত্বে পুলিশ মুহূর্তের মধ্যে এমন এক নির্মম হামলা চালায়, যে হামলা ও নির্মম নির্যাতনের সংবাদ বিশ্বের আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে ও প্রচার হয়েছে। এবং বিশ্বের সকল দেশের নেতৃবৃন্দ তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ-হুইপের উপর এ ধরনের নেংকার জনক হামলার ইতিহাস বাংলাদেশের মানুষ ভুলতে পারবে না।
বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নুল আবেদিন ফারুক তখন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ এবং একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য। কিন্তু সেদিন তার সংসদীয় পরিচয়, দেশের সাংবিধানিক মর্যাদা—কোনোটিই জয়নুল আবেদিন ফারুককে রক্ষা করতে পারেনি। সেই দিন একজন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সদস্যকে ঘিরে ধরে বেধড়ক মারধর করা হয়। টেনে-হিঁচড়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে তার গায়ের গেঞ্জি ছিঁড়ে দেওয়া হয়, মাথায় এবং পাজরে আঘাত করাসহ রক্তাক্ত জখম করে মৃত ভেবে ফেলে দেওয়া হয়। পরে পুলিশ জয়নুল আবদিন ফারুক কে মৃত ভেবে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে হাত পা ধরে পুলিশের ভ্যানগাড়ীতে তুলে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে আশ্ররাফ উদ্দিন নিজাম ও বিএনপি'র বাঘেনীকন্যা পাপিয়ার মত সাহসী সংসদ সদস্যদের প্রতিরোধের মুখে জয়নুল আবেদিন ফারুকের রক্তাক্ত নিতরদেহ মানিক মিয়া এভিনিউতে ফেলে দিয়ে যায়।
জয়নুল আবেদিন ফারুকের মাথা থেকে রক্ত বের হতে দেখে নারী সংসদ সদস্যরা ফারুক কে নিয়ে ন্যাম ভবনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানেও রেহাই ছিল না। পুলিশ আবার ধাওয়া করে। আত্মরক্ষার জন্য ফারুক দৌড়ে ন্যাম ভবনের দিকে যায়,পুলিশও পিছু নেয়। সেখানেও হামলা চালানো হয়। ফারুক-কে চ্যাংদোলা করে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। প্রচণ্ড আঘাতে এমপি ফারুক একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। পরে জরুরী চিকিৎসার জন্য তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় চিকিৎসকেরা জয়নুল আবেদিন ফারুকের মাথায় ১১টি সেলাই দেন।
এই ইতিহাস বাংলাদেশের মানচিত্রের ইতিহাসে জঘন্যতম ন্যাকার জনক হামলার ইতিহাস।
সেদিন শুধু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে আঘাত করা হয়নি,সেই দিন বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকাকে আঘাত করা হয়েছে। সেদিন সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদিন ফারুককে আঘাত করা হয়নি, সেদিন বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আঘাত করা হয়েছিল। একজন সংসদ সদস্য, একজন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ যদি দিনের আলোয় সংসদ ভবনের সামনে এমন নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী ছিল— তা সহজেই অনুমান করা যায়।
স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার আমলে ১৭ বছর দেশের বিচার ব্যবস্থা এতই দুর্বল ছিল যে বিরোধী দলের কোন মামলা পুলিশ প্রশাসন গ্রহণ করেনি।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক ছিল, এই ঘটনার পরও কার্যকর কোনো আইনি প্রতিকার পায়নি সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদিন ফারুক। যে রাষ্ট্রের পুলিশই নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত, সেই রাষ্ট্রের কাছেই বিচার চাইতে হয়েছিল। বিচার আর পাওয়া হয়নি।
সে দিনের কলঙ্কিত এই ঘটনায় মানুষ উপলব্ধি করতে বাকী নেই ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত করছে, যেখানে আইন নয়, ক্ষমতাই শেষ কথা।
পুলিশ জনগণের নিরাপত্তার বাহিনী থেকে ক্রমশ রাজনৈতিক দমন-পীড়নের যন্ত্রে রূপান্তরিত হচ্ছিল। বিরোধী মত, ভিন্ন কণ্ঠ, সমালোচনা—সবকিছুকে শক্তি প্রয়োগ করে দমিয়ে রাখার একটি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করেছিল শেখ হাসিনা ও আওয়ামিলীগ সরকার। পরবর্তী বছরগুলো যেন সেই উপলব্ধিকেই সত্য প্রমাণ করেছে।
একের পর এক বিরোধী দলের কর্মসূচিতে হামলা হয়েছে। অসংখ্য নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। গুম, নির্যাতন, হয়রানি, রাজনৈতিক মামলার অভিযোগ দেশজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়াই তাদের শাসনের অন্যতম কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়ে মানুষের আস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সংসদ সদস্য বিরোধীদলীয় চিফ-হুইপের উপর ঘটে যাওয়া ২০১১ সালের ৬ই জুলাই সেই ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সেটি একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সূচনা। এরপর বছরের পর বছর ধরে যে দমন-পীড়নের ধারাবাহিকতা দেশ দেখেছে, তার প্রমাণ সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের উপর যেভাবে পুলিশি নির্যাতনের নিরব এদেশের সাধারণ মানুষ ।
কোনো রাষ্ট্রই অনন্তকাল মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করে রাখতে পারে না। অন্যায় যত দীর্ঘ হয়, প্রতিরোধও তত গভীর হয়। ভয় যত বাড়ে, একসময় মানুষ ভয়কে অতিক্রম করতেও শেখে।২০২৪ সালের জুলাই সেই দীর্ঘ প্রতিরোধে ৫ই আগস্ট ২০২৪ স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার এক ঐতিহাসিক পতনের ঘন্টা বাজিয়ে বাংলাদেশের মাটিতে পরি-সমাপ্তি ঘটে এক দুর্নীতিবাজ সাম্রাজ্যের। জুলাইয়ের আন্দোলনে ফিরে এসেছে বাংলাদেশের নতুন গণতন্ত্র,বাক-স্বাধীনতা পেয়েছে বাংলাদেশের মানুষ, মুক্ত বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা সংবিধান ও গণতন্ত্র।
২০২৪ এর জুলাইয়ে নতুন প্রজন্মের সাহস দেখেছি, দেখেছি এমন সব তরুণকে যারা নিজের ভবিষ্যতের চেয়েও বড় করে দেশের ভবিষ্যৎকে ভাবতে শিখেছে। দেখেছি মানুষ ভয়কে অস্বীকার করে রাজপথে নেমে এসেছে। অসংখ্য পরিবার তাদের প্রিয়জন হারিয়েছে। অসংখ্য তরুণ প্রাণ ঝরে গেছে। রক্তে রঞ্জিত হয়েছে রাজপথ। প্রতিটি মৃত্যুই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক একটি ভারী অধ্যায়।
আমরা যখন ২০১১ সালের সেই রক্তাক্ত সকালটির কথা ভাবি, তখন মনে হয় ইতিহাস কখনো বিচ্ছিন্ন নয়। একটি ঘটনার সঙ্গে আরেকটি ঘটনা জড়িয়ে থাকে। সেদিন সংসদ ভবনের সামনে যে লাঠির আঘাত নেমে এসেছিল, তার প্রতিধ্বনি বহু বছর ধরে দেশের রাজপথে শোনা গেছে। একের পর এক আন্দোলনে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা বারবার এমন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, রাজপথে রক্তাক্ত হয়েছে তবুও তাদের প্রতিবাদ একদিনের জন্যও দমিয়ে থাকেনি । আর সেই দীর্ঘ যাত্রার শেষ অধ্যায় রচিত হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে, যখন মানুষ পরিবর্তনের দাবি নিয়ে রাজপথে নেমে আসে।
একজন মুক্তিযোদ্ধা জয়নুল আবেদিন ফারুকের শরীরের সেই ক্ষতচিহ্ন জাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়—গণতন্ত্রের মূল্য কত বড়, আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার কত ভয়াবহ হতে পারে।
সেদিন জয়নুল আবেদিন ফারুকের ওপর হামলার পর তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশনেত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, এই হামলা স্বৈরাচার পতনের বীজ বপন করলো। তার সেই কথার সত্যতা আমরা ঠিকই দেখতে পেয়েছি। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী অসম্ভব নির্যাতনের মধ্যেও গণতন্ত্রের এই লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন এবং স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশেই তিনি তার শেষদিনগুলো কাটাতে পেরেছেন।
ইতিহাসের বিচার শেষ পর্যন্ত মানুষের হাতেই হয়। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন। সেই বিশ্বাস নিয়েই ফারুক ভবিষ্যতের বাংলাদেশের দিকে তাকাতে চায়— এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কোনো নাগরিককে, কোনো রাজনৈতিক কর্মীকে, কোনো সংসদ সদস্যকে তার মত প্রকাশ্য নির্যাতনের শিকার যেন না হয়। এমন ৬ জুলাইয়ের মতো নির্মম নির্যাতনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কাউকে যেন যেতে না হয়। এদিকে নোয়াখালী ২ সেনবাগ সংসদীয় আসনের নাগরিক সমাজ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতাকর্মীদের দাবি ৬ জুলাইয়ের নেংকারজনক হামলার মাস্টারমাইন হারুন ও বিপ্লবের গংদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
এ জাতীয় আরো খবর...