
পারভেজ বাঙালী
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি |
চট্টগ্রামের রাউজানে বহুল আলোচিত মোহাম্মদ করিম হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দেশীয় এলজি, এয়ার গান, দুই রাউন্ড ১২ বোরের সীসা কার্তুজ, চাপাতি ও লোহার গ্রিল কাটার উদ্ধার করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জানায়, পুলিশ সুপার মোঃ মাসুদ আলম, বিপিএম-এর সার্বিক দিকনির্দেশনায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ নিবিড় তদন্ত ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে রাউজান থানাধীন উরকিরচর ইউনিয়নের কেরানিহাট এলাকায় প্রকাশ্যে মোহাম্মদ করিমকে হত্যা করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সিএনজিযোগে আসা একদল ব্যক্তি করিমকে ঘিরে প্রথমে গুলি করে। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মাথা ও ঘাড়ে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
ঘটনার পর চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।
নিহত মোহাম্মদ করিম রাউজানের উরকিরচর ইউনিয়নের হারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি আমান বাজার এলাকায় বসবাস করতেন। পুলিশ জানিয়েছে, করিমের বিরুদ্ধে চুরি, মাদক, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১০টি মামলা রয়েছে।
মোটরসাইকেল চুরির সন্দেহ থেকে হত্যাকাণ্ড
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে জেলা পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১০ দিন আগে পারভেজের মামা আজগরের একটি মোটরসাইকেল চুরি হয়। ওই ঘটনায় পারভেজ করিমকে সন্দেহ করেন এবং মোটরসাইকেলটি ফেরত দেওয়ার জন্য তাকে চাপ দেন। করিম মোটরসাইকেল চুরির সঙ্গে জড়িত নন বলে জানালে পারভেজ তার ওপর ক্ষুব্ধ হন।
পুলিশের দাবি, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় পারভেজ তার নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে কৌশলে করিমকে রাউজানের কেরানিহাট বাজার এলাকায় ডেকে আনেন। সেখানে পারভেজসহ অন্য আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে করিমকে প্রথমে গুলি এবং পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
যেভাবে গ্রেপ্তার চারজন
জেলা গোয়েন্দা পুলিশ স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে।
এর ধারাবাহিকতায় প্রথমে চট্টগ্রাম নগরের চাঁদগাঁও থানাধীন কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকা থেকে সৈয়দ মোহাম্মদ শুক্কুর (২৭) ও মোঃ জাবেদ (২৮)কে গ্রেপ্তার করা হয়।
তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র ও কার্তুজ রাউজান থানাধীন পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের মগদাই এলাকায় পলাতক আসামি পারভেজের পরিত্যক্ত গরুর ফার্মে রাখা হয়েছে।
পরে গ্রেপ্তার শুক্কুর ও জাবেদকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় সাক্ষীদের উপস্থিতিতে ১৪ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ৫ মিনিটে ওই গরুর ফার্মে অভিযান চালানো হয়। পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার আসামিদের দেখানো ও তাদের নিজ হাতে বের করে দেওয়ার ভিত্তিতে ফার্মের ভেতরে সিমেন্টের তৈরি গামলার মধ্যে বিশেষভাবে লুকিয়ে রাখা অস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
একই অভিযানের ধারাবাহিকতায় হাটহাজারী থানাধীন দক্ষিণ মাদার্শা এলাকা থেকে মোঃ সেলিম (৫০) ও মোঃ আলামিন (২৯)কে গ্রেপ্তার করা হয়।
উদ্ধার করা হয়েছে যেসব আলামত
- একটি লোহার তৈরি দেশীয় এলজি
- একটি দেশীয় তৈরি এয়ার গান
- ১২ বোরের দুই রাউন্ড সীসা কার্তুজ
- একটি চাপাতি
- একটি লোহার গ্রিল কাটার
গ্রেপ্তার চার আসামি
গ্রেপ্তার সেলিম উরকিরচর ইউনিয়নের বাসিন্দা। তার বিরুদ্ধে একটি চুরির মামলা রয়েছে।
সৈয়দ মোহাম্মদ শুক্কুর (২৭) ও মোঃ জাবেদ (২৮) একই ইউনিয়নের বাসিন্দা। জাবেদের বিরুদ্ধে একটি অপহরণ মামলা রয়েছে।
মোঃ আলামিন (২৯)-এর বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে দুটি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পারভেজের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা
থানা রেকর্ড ও সিডিএমএস যাচাই করে পুলিশ জানিয়েছে, মামলার অন্যতম পলাতক আসামি মোঃ পারভেজ (৪৫)-এর বিরুদ্ধে রাউজানসহ বিভিন্ন থানায় হত্যা, ডাকাতি, অস্ত্র, নারী ও শিশু নির্যাতন, বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন অপরাধে একাধিক মামলা রয়েছে। তার পূর্বের মামলাগুলোর মধ্যে হত্যা, ডাকাতি ও অস্ত্র আইনের মামলাও রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার অন্যতম পলাতক আসামি পারভেজসহ অন্য পলাতকদের গ্রেপ্তারে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেপ্তার আসামিদের বিরুদ্ধে এবং পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে পৃথক মামলা করা হয়েছে।