
আশীষ বিশ্বাস
নীলফামারী প্রতিনিধি
জলঢাকায় ফ্যামিলি কার্ডের শুমারী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ
নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নিয়োগের নির্ধারিত শর্ত যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করে পছন্দের ব্যক্তি ও পরিচিতজনদের নির্বাচিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন চাকরিপ্রত্যাশী। ফ্যামিলি কার্ড শুমারির নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই নির্বাচিত তালিকা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও আলোচনা শুরু হয়।
জানা গেছে, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উপকারভোগীদের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য জলঢাকা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের উদ্যোগ নেয় উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়। এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভা থেকে বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রত্যাশী আবেদন করেন। গত ২৮ জুলাই আবেদনকারীদের মৌখিক পরীক্ষার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ডাকা হয়। সকাল থেকেই বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আসা প্রার্থীদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় পরবর্তীতে ধাপে ধাপে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
চাকরিপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার পর তারা একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর নির্বাচিত কয়েকজনের পরিচয়, যোগ্যতা ও পূর্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রার্থীদের দাবি, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে নারী প্রার্থীদের ৫০ শতাংশ এবং পূর্বে বিবিএস জরিপে কাজের অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও চূড়ান্ত তালিকায় তা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট ধরনের তথ্য সংগ্রহ বা শুমারি কার্যক্রমে পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই—এমন কয়েকজনও নির্বাচিত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
বালাগ্রাম ইউনিয়নের চাকরিপ্রত্যাশী ওয়াদূত পাটোয়ারী অভিযোগ করে বলেন, “বালাগ্রাম ইউনিয়নে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কয়েকশ হলেও পৌরসভার একজন নাগরিককে ওই ইউনিয়নের নির্বাচিত তালিকায় রাখা হয়েছে। একই ব্যক্তির নাম নির্বাচিত ও অপেক্ষমাণ—দুই তালিকাতেই রয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, কৈমারী ইউনিয়নের তালিকাতেও একই ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে।”
গোলমুন্ডা ইউনিয়নের আরিফুজ্জামান নামে এক চাকরিপ্রত্যাশী অভিযোগ করেন, “গোলমুন্ডায় একটি পরিবারের ভাই-বোন নির্বাচিত হয়েছেন। ওই পরিবারের কর্তা একটি রাজনৈতিক দলের ইউনিয়ন সেক্রেটারি পদে রয়েছেন।” এ ছাড়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রার্থী রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও প্রভাবের মাধ্যমে কয়েকজনকে নির্বাচিত করার অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, মেধা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিয়োগ না হয়ে থাকলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তাঁদের প্রশ্ন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যদি স্বজনপ্রীতি বা পূর্বনির্ধারিত কোনো সুপারিশের প্রভাব থাকে, তাহলে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন কী?
অভিযোগকারীদের দাবি, বালাগ্রাম ও গোলমুন্ডা ইউনিয়নের নির্বাচিত তালিকায় থাকা কয়েকজনের পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি রয়েছে। এছাড়া জলঢাকা পৌরসভার মাত্র দুই-তিনটি ওয়ার্ড থেকেও একাধিক ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, আবেদনকারীদের তথ্য, নির্বাচনী নম্বর এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার মূল্যায়ন পদ্ধতি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, ফ্যামিলি কার্ড হলো বর্তমান বিএনপি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি। এ কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বে অনিয়মের মাধ্যমে লোক নিয়োগ করা হলে মাঠপর্যায়ে প্রকৃত উপকারভোগীদের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এদিকে অভিযোগকারী চাকরিপ্রত্যাশীরা নিয়োগ কার্যক্রম পর্যালোচনা, অভিযোগের তদন্ত এবং প্রয়োজন হলে নির্বাচিত তালিকা পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে যোগ্য প্রার্থীদের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়ারও দাবি জানান তারা।
এ বিষয়ে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ নির্বাচন কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, “মেধার ভিত্তিতেই সবাইকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংশোধনের সুযোগ নেই। কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিটির সভাপতি ও জলঢাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস হ্যাপির বক্তব্য জানতে তাঁর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।