
পারভেজ বাঙালী, চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি
চট্টগ্রামকে পরিচ্ছন্ন, ডেঙ্গুমুক্ত ও বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তুলতে সপ্তাহের একটি দিন ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার জন্য নির্ধারণ করার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেছেন, প্রতি শনিবার অন্তত এক ঘণ্টা নিজেদের বাসা, ছাদ, আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পরিচ্ছন্নতার চর্চা পরিবার থেকে শুরু হয়ে বিদ্যালয়ের মাধ্যমে সমাজে ছড়িয়ে পড়তে হবে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘পরিচ্ছন্ন করি নগর-গ্রাম, গড়ি নান্দনিক চট্টগ্রাম’ শীর্ষক প্রস্তুতিমূলক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় সরকারি দপ্তরগুলোর কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।
মেয়র বলেন, শুধু সিটি কর্পোরেশন বা সরকারি সংস্থার উদ্যোগে একটি শহর পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয়। নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণই পারে এই পরিবর্তনকে স্থায়ী রূপ দিতে। প্রত্যেকে যদি নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নেন, তাহলে পুরো নগরের চিত্রই বদলে যাবে।
তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নতা একটি সামাজিক অভ্যাস। তাই শিশুদের ছোটবেলা থেকেই এ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে। এ উদ্দেশ্যে সিটি কর্পোরেশনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘স্কুল হেলথ স্কিম’ চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।
নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে মেয়র জানান, চট্টগ্রামে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ২০০ মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেট্রিক টন সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। অবশিষ্ট বর্জ্য খাল-নালা ও উন্মুক্ত স্থানে পড়ে থেকে জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ এবং নদীর প্রতিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, অল্প পরিমাণ স্বচ্ছ পানিতেই এডিস মশার লার্ভা জন্ম নিতে পারে। তাই বাসাবাড়ির ছাদ, ফুলের টব, ডাবের খোসা কিংবা পরিত্যক্ত পাত্রে তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না। জানুয়ারি থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত মহানগরে ২২৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হলেও কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তবে উপজেলাগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে এবং সেখানে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানান তিনি।
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর ‘ক্লিন, গ্রিন, হেলদি অ্যান্ড সেফ সিটি’ লক্ষ্য সামনে রেখে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে ৪১টি খেলার মাঠ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ১১টির কাজ শেষ হয়েছে। নাগরিক সেবা সহজ করতে চালু করা হয়েছে একটি ডিজিটাল অভিযোগ ব্যবস্থাপনাও।
বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন মেয়র। তিনি বলেন, বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস, বিদ্যুৎ ও গ্রিন ডিজেল উৎপাদনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ চলছে। পাশাপাশি হালিশহর ও আরেফিন নগরের ল্যান্ডফিল আধুনিকায়নে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে ২০টি ওয়ার্ডে বিনামূল্যে ডোর-টু-ডোর বর্জ্য সংগ্রহ কার্যক্রমও চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক। এতে বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে মেয়র বলেন, “পরিচ্ছন্নতা কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়; এটি নাগরিক জীবনের একটি নিয়মিত চর্চা। এই অভ্যাস গড়ে উঠলে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব হবে।”