প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 24, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 24, 2026 ইং
বখাটেদের আড্ডা বনাম পথচারীদের নিরাপত্তা, ইকরাশির কালভার্ট ঘিরে অদ্ভুত জটিলতা

বখাটেদের আড্ডা বনাম পথচারীদের নিরাপত্তা, ইকরাশির কালভার্ট ঘিরে অদ্ভুত জটিলতা
শহীদুল ইসলাম শরীফ,
নিজস্ব প্রতিনিধি,
বখাটেদের আড্ডা, ইভটিজিং এবং মাদক সেবনের হাত থেকে রক্ষা পেতে কালভার্টের রেলিং নির্মাণ বন্ধ রাখার এক ব্যতিক্রমী ও চাঞ্চল্যকর খবর পাওয়া গেছে। ঢাকার দোহার উপজেলার রাইপাড়া ইউনিয়নের ইকরাশি গ্রামে একটি ছোট খালের ওপর নির্মিত কালভার্টে দীর্ঘদিন ধরে কোনো রেলিং নেই। সাধারণত পথচারীদের সুরক্ষার জন্য রেলিং দেওয়া হলেও, এখানে তা না থাকার পেছনে রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের এক অভিনব সামাজিক আপত্তি। তবে রেলিং না থাকায় একদিকে যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে খালের দুই পাশের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মৃতপ্রায় জলাশয়ে পরিণত হয়েছে ঐতিহাসিক এই খালটি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২০২৪ সালের পূর্ববর্তী মেয়াদে তৎকালীন নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যানের আমলে এই গুরুত্বপূর্ণ কালভার্টটির ভেঙে যাওয়া রেলিং পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের জোরালো অনুরোধ ও আপত্তির মুখে তৎকালীন কর্তৃপক্ষ রেলিং মেরামত বন্ধ রাখেন।
এ বিষয়ে রাইপাড়া ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য (মেম্বার) নাহিদা সুলতানা জানান, "এলাকাবাসী সে সময় মৌখিকভাবে জোর অনুরোধ করেছিলেন, যাতে কালভার্টের রেলিং নির্মাণ না করা হয়। তাদের অভিযোগ ছিল, রেলিং থাকলে সেখানে দিন-রাত এলাকার বখাটে যুবকেরা বসে আড্ডা দেয়। এর ফলে ওই রাস্তা দিয়ে যাতায়াতকারী স্কুল-কলেজের ছাত্রীরা প্রতিনিয়ত ইভটিজিংয়ের শিকার হতো। এছাড়া গভীর রাত পর্যন্ত বখাটেরা রেলিংয়ে বসে গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের নেশা করত। তাই সামাজিকভাবে শান্তি ও মেয়েদের নিরাপত্তা বজায় রাখতে এলাকাবাসী রেলিং ছাড়াই কালভার্টটি রাখার পক্ষে মত দেন।"
জনবহুল এই সড়কের কালভার্টটিতে রেলিং না থাকায় বিশেষ করে রাতে চলাচলের ক্ষেত্রে চরম ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সড়কটিতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় অসাবধানতাবশত যে কোনো সময় বড়ো ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, দুর্ঘটনার ঝুঁকির চেয়ে তাদের কাছে মেয়েদের ইজ্জত রক্ষা ও মাদকমুক্ত পরিবেশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে কালভার্টটির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা বা দায় এড়ানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। দোহার উপজেলা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী মো: শহীদুল ইসলাম জানান, এ ধরনের সেতু তাদের আওতাধীন নয়। তিনি এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) অফিসে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে পিআইও অফিসের উপসহকারী প্রকৌশলী মো: আবদুস সালামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনিও দাবি করেন, এই ব্রিজটি তাদের আওতাধীন নয়। তবে তিনি উল্লেখ করেন, "ভবিষ্যতে এই ব্রিজের রেলিং নির্মাণ করতে হলে সর্বসাধারণ বা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে নতুন করে দরখাস্ত জমা দিলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা যেতে পারে।"
রেলিং বিতর্কের পাশাপাশি কালভার্টের নিচের ছোট খালটির অস্তিত্ব এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে। খালের দুই পাশের মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এক সময়ের সচল খালটি এখন ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় এবং একটি মৃতপ্রায় বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়েছে, যা স্থানীয় পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এলাকার সচেতন মহলের মতে, বখাটে বা অপরাধীদের ভয়ে কালভার্টের রেলিং মেরামত না করা কোনো স্থায়ী বা বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান হতে পারে না। এতে যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে, তেমনি অপরাধীদের কাছে একপ্রকার নতি স্বীকার করা হচ্ছে।
ইকরাশি গ্রামের সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিকেরা এখন প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন, অনতিবিলম্বে কালভার্টটিতে মজবুত রেলিং বা নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ এবং খালের বন্ধ হয়ে যাওয়া মুখ দুটি সচল করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা হোক।
আজ রোজ বুধবার ২৪-জুন ২০২৬।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ দৈনিক পুনর্জাগরণ বিডি ২৪